Also read in

অপুষ্টিতে ভোগা মহিলা-শিশুর খাবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন সাধারণ মানুষ; প্রশাসনের অভিনব উদ্যোগ "পর্ভারিশ"

আমাদের সমাজে প্রথা রয়েছে অনেকেই শিশু দত্তক নেন, কেউ কেউ পুরো একটা গ্রাম দত্তক নেন। এর অর্থ হচ্ছে শিশু বা গ্রামের প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাস্থ্য, সুরক্ষার, ইত্যাদির দায়িত্ব নেওয়া। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে কাছাড় জেলা প্রশাসন। শিশু বা গর্ভবতী মহিলা খাবারের দায়িত্ব নেওয়ার একটি প্রথা চালু করা হয়েছে, এর নাম দেওয়া হয়েছে “পর্ভারিশ”, অর্থাৎ লালনপালন করা। এর অধীনে কোনও ব্যক্তি অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা গর্ভবতী মহিলার খাবারের দায়িত্ব নিতে পারেন। সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাদের এই ক্ষমতাটুকু রয়েছে, আবার কেউ কেউ স্বল্প সামর্থের মধ্যেও অন্যের পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসেন।

সরকারের পোষন মাস হিসেবে পুরো সেপ্টেম্বর জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলছে। এর অধীনে কাছাড়ের প্রশাসন নতুন উদ্যোগটি নিয়েছে যা সারা রাজ্যে প্রথম। সোমবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর বিধানসভা সমষ্টির অন্তর্গত রাজাবাজার আইসিডিএসের উদ্যোগে আয়োজিত প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন জেলাশাসক কীর্তি জাল্লি। প্রথমে এক গর্ভবতী মহিলাকে পুষ্টিকর খাদ্য খাইয়ে ঘরোয়া নিয়মের আদলে অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। সঙ্গে বেশ কিছু চারা রোপণ করেন যার ফল গর্ভবতী মহিলাদের জন্য পুষ্টিকর। এলাকার বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী এবং সংস্কৃতির মহিলারা নিজেদের এলাকার নানান পুষ্টিকর ফল মুল দিয়ে খাদ্য তৈরি করে এদিন অনুষ্ঠান চত্বরে স্টল দেন। এতে আমলকি, পেঁপে, স্থানীয় শাকসবজি ইত্যাদির মাধ্যমে নানান ধরনের খাবার ছিল যেগুলো দেখা মাত্রই শিশুরা আকৃষ্ট হবে। জেলাশাসক নিজে হাত বাড়িয়ে খাবার গুলো চেখে দেখেন।

এরপর ছোটখাটো একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় যেখানে স্থানীয় শিশুরা গান করে। সঙ্গে নানান সচেতনতামূলক আলোচনা হয়। জেলাশাসক তার ভাষণে বলেন, “আমরা পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে শুধুমাত্র মাংস-পনির ইত্যাদি খাব এমনটা নয়। চারপাশে প্রকৃতির দেওয়া এমন খাবারে রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। শিশুদের খাবার প্রতি আকৃষ্ট করার একটি বিশাল বড় কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। সাধারণত শিশুরা কোলড্রিংস, চিপস জাতীয় ক্ষতিকারক খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। আজ এখানে মহিলারা আমলকির জেলি, পেঁপের নাড়ু, শাক সবজির আচার, তুলসীর নাড়ু অভিনব কিছু খাদ্য প্রদর্শন করেছেন যা শিশুদের আকৃষ্ট করতে সমর্থ হবে এবং তাদের পুষ্টিও দেবে। তাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা এভাবেই শিশুদের পুষ্টি যোগাবেন এবং যাদের সামর্থ্য কম তাদের পাশে অন্যরা দাঁড়াবেন, এটাই আমাদের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।”

এদিন জেলাশাসক এবং স্থানীয় দুই ব্যক্তি তিনটি শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা প্রতি সপ্তাহে এই শিশুদের জন্য খাবার জোগান দেবেন, যতদিন না তাদের অপুষ্টি দূর হয়।

গর্ভবতী মহিলাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রত্যেক শিশুই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যতে এরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস, বৈজ্ঞানিক যেকোনও কিছু হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে জন্ম নেয়। তাদের জন্মের প্রক্রিয়াকে যাতে সুস্থ এবং সুন্দর রাখা যায়, যারা তাদের জন্ম দেবেন সেই মাকে যাতে সুস্থ রাখা যায় এটাই আমাদের লক্ষ্য। শিশু জন্মের আগে থেকেই এই ব্যবস্থা নিতে হবে, ভালো খাবার পৌঁছে দিতে হবে। পুষ্টিগুণসম্পন্ন ঘরের বানানো খাবার নিয়ম করে খেতে হবে। চায়ে লবণ দেবেন না, কাঁচা লবণ খাওয়া বন্ধ করুন। বাঙালি খাবার খেতে ইচ্ছে না হলে মনিপুরী খাবার খান, মনিপুরী ইচ্ছে না হলে ডিমাসা খাবার খান, ডিমাসা ভালো না লাগলে নাগা রেসিপি চেষ্টা করুন, তবে যেটাই করুন খাবার যাতে বাদ না যায়। প্রত্যেকে মিলে মায়েদের এবং শিশুদের খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে, তবে সমাজে মেধাবী শিশুরা স্বাচ্ছন্দে বড় হয়ে উঠবে।”

এদিন জেলাশাসকের সঙ্গে অনুষ্ঠানে যোগ দেন অতিরিক্ত জেলাশাসক ললিতা রংপিপি, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসার শাশ্বতী সোম, এলাকার জেলা পরিষদ প্রতিনিধি সুদীপ কুমার, পর্ভারিশ প্রকল্পের তরফে দেবজ্যোতি নাথ, বিভাগের কর্মী পার্থ দাস সহ অন্যান্যরা।

Comments are closed.

error: Content is protected !!