
খেলোয়ার বলুন অথবা অ্যাথলিট, প্রত্যেকেরই স্বপ্ন থাকে শীর্ষ স্তরে খেলার। শীর্ষ স্তরে পারফর্ম করার। এর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে একটা ভালো চাকরি পাবার স্বপ্নও। ক্লাব স্তর থেকে যাত্রা শুরু করে একজন অ্যাথলিট যখন রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে সুনাম অর্জন করেন তখন তার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। সম্ভাবনা বেড়ে যায় একটা চাকুরির। এমনটাই তো হবার কথা। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনটা হয় না। আর আমাদের বরাক উপত্যকা তো এক্ষেত্রে আরও অনেক পিছিয়ে। এখানে শীর্ষ স্তরে পারফর্ম করেও মিলে না কোনও চাকরি। মিলে শুধু প্রতিশ্রুতি। জেলা ও রাজ্য দলের হয়ে সুনাম অর্জন করলেও ব্রাত্যই থেকে যেতে হয়। ঠিক এমনটাই ঘটেছে শিলচরের তারকা অ্যাথলিট পিন্টু রামের সঙ্গে।
সম্ভবত ২০০৪-০৫ সালের কথা। এক অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে পিন্টু রামের দিকে নজর পড়ে শিলচর ডি এস এর প্রাক্তন মাইনর সচিব সত্যজিৎ দাস এর। মূলত বদরপুরের বাসিন্দা পিন্টু। তবে সত্যজিৎ স্যারের কথায় শিলচর থেকেই তার কেরিয়ার শুরু করতে রাজি হয়ে যান। সত্যজিতের হাত ধরেই শিলচরে প্রথম কোচিং ক্যাম্পে অংশ নেন। সে ছিল সফরের শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শট পুটার ও ডিসকাস থ্রোয়ার পিন্টুকে।
শিলচরের হয়ে আন্তঃজেলা অ্যাথলেটিকস মিটে টানা সাফল্য তাকে খুব কম সময়েই রাজ্য দলের টিকিট এনে দেয়। জেলা দলের প্রতিনিধিত্ব করে মোট ৭ বার নিজের ক্যাটাগরিতে পদক জিতেছেন পিন্টু রাম। এরমধ্যে ছিল ছটি সোনা। একটি রুপো। ঝাড়খন্ডে রাজ্য দলের প্রতিনিধিত্ব করে ডিসকাস থ্রো তে সোনা জয়ের নজির রয়েছে তার। ছোট থেকেই দারুন প্রতিভাবান ছিলেন পিন্টু রাম। অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশোনা করার সময় থেকেই একজন অ্যাথলিট হিসেবে তার কেরিয়ার শুরু হয়েগিয়েছিল। কর্নাটকের মাইসুরে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় শটপুটে পঞ্চম স্থান দখল করেছিলেন জেলার এই তারকা অ্যাথলিট।
২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত চুটিয়ে চালিয়ে গেছেন পিন্টু রাম। সাফল্যও পেয়েছেন সেরকম। কিন্তু এতসবের পর ও তিনি রাজ্য ও জেলা স্তরে ব্রাত্য থেকে গেছেন। অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেননি। কয়েক বছর আগে একটা প্রাইভেট স্কুলে স্পোর্টস টিচারের চাকরি পেয়েছিলেন। সে চাকরি করেও ছিলেন। কিন্তু তা দিয়ে তার সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না। এরমধ্যে করোনার জন্য লকডাউন লেগে যাওয়ায় সেই চাকরি ও হাত থেকে চলে যায়। এই মুহূর্তে পিন্টুর হাতে কোনও চাকরি নেই। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, জেলা ও রাজ্য দলের একজন সফল অ্যাথলিট হবার পরও তাকে বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। যার ফলে এখন অ্যাথলেটিক্স থেকে তার মনই উঠে গেছে।
পিন্টু জানান,একটা চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তাকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন দাপুটে মন্ত্রী গৌতম রায়। তার সঙ্গে কয়েকবার দেখাও করেছিলেন পিন্টু। জমা দিয়েছিলেন বায়োডাটা ও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শিলচরের প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেবের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন পিন্টু। সাংসদের কথামতো জমা দিয়েছিলেন বায়োডাটা। সেখানেও খালি হাতেই থাকতে হয়েছে জেলার তারকা অ্যাথলিটকে। এত বছর একজন অ্যাথলিট হিসেবে সুনাম অর্জন করার পরও ব্রাত্য থেকে যাওয়ায় এখন অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছেন পিন্টু। তিনি বলছিলেন, ‘এখন সবাই জেনে গেছে জেলা দলের প্রতিনিধিত্ব করে কোনো লাভ নেই। এমনকি রাজ্য দলের হয়েও খেলে কোনও লাভ নেই। কারণ কেউ আপনাকে সরকারি চাকরি দেবে না। তাই এখন অ্যাথলেটিক্সের প্রতি আমার সেই আবেগটা আর নেই। শুধু আমি কেন, এখন আমাদের এখানে সবাই জেনে গেছে এসব খেলাধুলা করে কোনও লাভ নেই। তাই আমাদের এখানে খেলাধুলার প্রতি সেই ঝোঁকটাও অনেকটা কমে গেছে।’
পিন্টুর এই কথাগুলি কিন্তু মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। বরং আজকের দিনে বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। দিনের পর দিন যারা জেলা, রাজ্য এমনকি জাতীয় স্তরে সুনাম অর্জন করেছেন তাদের সঙ্গে যদি এমন বঞ্চনা করা হয় তাহলে উঠতি দের কাছে কেমন বার্তা পৌঁছাবে? কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, পিন্টুর মত এমন অনেকেই রয়েছেন যারা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। তারপরও কিন্তু আমাদের সিস্টেমে কোনও পরিবর্তন আসছে না। সরকার বদল হচ্ছে, কিন্তু মানসিকতা আজও একই রয়ে গেছে। আর এমন মানসিকতার বলি হতে হচ্ছে পিন্টু রামদের।
Comments are closed.