Also read in

করোনার জেরে আর্থিক সংকট : খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার রাজু হাজাম

করোনা গোটা বিশ্বকে আর্থিক মন্দায় ঠেলে দিয়েছে। মানুষকে আর্থিকভাবে একরকম পঙ্গু করে দিয়েছে এই মহামারী ভাইরাস। গতবছর করোনার জেরে দীর্ঘ সময় লকডাউন ছিল। ফলে গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে সবাইকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বারোটা বেজে গিয়েছিলো। গত ছয় মাসে সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল মানুষ। কিন্তু এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ গোটা দেশে আছড়ে পড়ল। রেকর্ড হারে বাড়তে শুরু করলো দৈনিক সংক্রমণ। সেই সঙ্গে আতঙ্কের সৃষ্টি করলো মৃত্যুর মিছিল। ফলে ফের একবার গোটা দেশে তৈরি হয়ে গেল লকডাউন এর মত পরিস্থিতি। আমাদের রাজ্যে ও লেগে গেল কারফিউ। ফলে ফের একবার ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠে গেল।

এই মুহূর্তে রাজ্যে সকাল ৫ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকছে। তারপর দুপুর ১২ টা থেকে লেগে যাচ্ছে কারফিউ। ফলে এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুই হচ্ছে না বলা চলে। যাদের ছোট ব্যবসা বা দোকান রয়েছে, তারা তো খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। এমনই একজন হলেন শিলচরের প্রাক্তন ক্রিকেটার রাজু হাজাম।

তারাপুরে নিজের বাড়ির পাশেই রাজু হাজামের একটা ছোট্ট পানের দোকান রয়েছে। দুটি ছোট্ট ছেলে, স্ত্রী ও মা কে নিয়ে মোট পাঁচজনের সংসার তার। ছোট্ট একটা পান দোকান দিয়ে এই সংসার চালানো এমনিতেই কষ্টকর। তারমধ্যে করোনার জেরে লকডাউন ও কারফিউ রাজু হাজামের সংসারকে আরো গভীর আর্থিক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে শিলচরের ক্রিকেটে এক পরিচিত নাম ছিলেন রাজু হাজাম। এই বাঁহাতি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান নিজের সময়ের অন্যতম স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান ছিলেন। ১৯৯৬ সালে স্টুডেন্ট এসি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন রাজু। সেবার তিনি খেলেছিলেন বি ডিভিশনে। তার পরের বছর তারাপুর স্পোর্টিংয়ের হয়ে খেলেন দ্বিতীয় ডিভিশনে। তবে নিজের পারফরম্যান্সের জোরে পরের বছর থেকেই স্থান করে নেন প্রথম ডিভিশনের দল তারাপুর এসিতে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি বাঁহাতি রাজু।

ক্লাসমেটস ইউনিয়ন, ইটখোলা এসি, শিলচর স্পোর্টিং ক্লাব, বিজয়ী সংঘ এবং উদয়ন সংঘের জার্সি গায়ে প্রথম ডিভিশনে খেলে ছিলেন তিনি। এরমধ্যে ইটখোলায় টানা তিনবার খেলার রেকর্ড রয়েছে রাজুর। শিলচরের ক্রিকেটে রাজু হাজামের একটা বিশেষ রেকর্ডও রয়েছে। শোনা যায়, একটা মরশুমে রাজু এমনই ফর্মে ছিলেন যে আন্তঃক্লাব দলবদল এর দিন তাকে নাকি লুকিয়ে রেখেছিল একটা ক্লাব।
রাজু হাজামের বাবা অর্জুন হাজাম জেলার একজন প্রাক্তন ফুটবলার ছিলেন। গোটা জেলায় প্রয়াত ফুটবলার অর্জুন হাজামের বেশ নামডাক ছিল। ৬০ এর দশকে সিনিয়র আন্তঃজেলা ফুটবলে একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল শিলচর। সেই দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন অর্জুন হাজাম। ‌ দলের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন তিনি। বেশ কয়েকবার ডাক পেয়েছিলেন রাজ্য দলের ট্রায়ালে। কিন্তু আর্থিক দরিদ্রতার জন্য তার ফুটবল ক্যারিয়ার সে ভাবে এগোতে পারিনি।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, অর্জুন হাজামের ছেলের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেই আর্থিক দুর্বলতাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবারের চাপ সামলাতে ক্রিকেট ছাড়তে হয়েছিল রাজু হাজাম কে। বাড়ির সঙ্গেই একটা ছোট্ট পানের দোকান দিয়ে গত কয়েক বছর থেকে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। রাজু জানান, অনেক কষ্ট হলেও কোনরকম এই ছোট্ট দোকান দিয়ে ৫ জনের সংসার চালিয়ে নিতেন। তবে লকডাউন এবং পরবর্তীকালে কারফিউ তার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। রাজু বলেন, ‘খুবই কষ্টে দিন কাটছে। আমার ছোট্ট একটা পানের দোকান। আয় খুবই সীমিত। তবে এখন কারফিউ থাকায় সেটাও আসছেনা। সকালে দোকান খোলার কিছুসময়ের মধ্যেই আবার বন্ধ করে নিতে হয়। কাজেই এমন পরিস্থিতিতে কত টাকার বেচা বিক্রি হবে বলুন তো।’

গোটা দেশে সংক্রমণের হার কিছুটা কম হলেও কাছাড় জেলায় গত কয়েকদিন থেকেই করোনার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। এমন পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, আর কবেই বা দোকানপাট ফের খুলবে? সেটাই বুঝতে পারছেন না রাজু হাজাম। তিনি বলেন, ‘জানি না কিভাবে চলব। কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না। গত ক’দিন থেকে রোজ সকালে দোকান খুলছি। কিন্তু বিক্রি-বাট্টা হচ্ছে না। গতকাল তো এক টাকাও বিক্রি হয়নি। এভাবে আর কতদিন চলা যাবে।’

এটা হচ্ছে করোনার আরও এক ভয়াবহ দিক। রাজু হাজামের মতো এমন অনেকেই রয়েছেন যাদের আর্থিক ভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে কোভিড ১৯।

Comments are closed.

error: Content is protected !!