
উত্তরপূর্বে সবথেকে বেশি আরটিপিসিআর পরীক্ষার রেকর্ড গড়লো শিলচর মেডিক্যাল
অসমের প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হয়েছিল শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। প্রায় ৪০ দিন চিকিৎসার পর রোগীকে সুস্থ করা হয়েছিল এবং তাকে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিতে এসেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। করোনা পরিস্থিতিতে শুধু বরাক উপত্যকা নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর কাছে সবথেকে ভরসাযোগ্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে গেছে হাসপাতালটি। এবার হাসপাতালে কৃতিত্বের তালিকায় নতুন পালক জুড়ে গেছে। শুধু অসম নয়, সারা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম মেডিক্যাল কলেজ হিসেবে দুই লক্ষের বেশি আরটিপিসিআর পরীক্ষা হয়েছে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এটাই প্রমাণ করে দেয় হাসপাতালটি কতটুকু দ্রুত গতিতে কাজ করছে।
সোমবার হাসপাতালের সহকারি অধ্যক্ষ ডাঃ ভাস্কর গুপ্ত জানিয়েছেন, এদিন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত হাসপাতলে ২ লক্ষ ২৮১টি আরটিপিসিআর পরীক্ষা হয়েছে। এতে মোট ৭,৬০৯ জন ব্যক্তির শরীরে থাকা সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। এক সময় শুধুমাত্র শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই আরটিপিসিআর পরীক্ষা হয়েছে। তবে এই বছর আইসিএমআর আরও বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই পরীক্ষা করার অনুমতি দিয়েছে। তবু বরাক উপত্যকায় আরটিপিসিআর পরীক্ষার শীর্ষে রয়েছে হাসপাতালটিই। এবার উত্তর-পূর্বে প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমন বিরল নজির স্থাপন করে এক বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে শিলচর মেডিক্যাল।
হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডাঃ বাবুল বেজবরুয়া বলেন, “শুধুমাত্র মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ নয়, এটা হাসপাতালের প্রত্যেক চিকিৎসক এবং কর্মচারির কৃতিত্ব। প্রত্যেকে নিজের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে নির্ভয় হয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং এখনও কাজ করে যাচ্ছেন। রাজ্য সরকার একের পর এক নতুন প্রকল্প আমাদের দিচ্ছেন, এতে চিকিৎসা পরিসেবা উন্নত হচ্ছে। গতবছর প্রথমে ৪০টি আইসিইউ দেওয়া হয়েছিল, এরপর সেটা বাড়িয়ে ১০০ করা হয়। এবার আরও অতিরিক্ত ৪০টি আইসিইউয়ের কাজ চলছে। হাসপাতালের প্রত্যেক স্তরের কর্মীরা নতুন নতুন বিষয় শিখছেন এবং তাদের পরিষেবা উন্নত হচ্ছে। এসব কৃতিত্ব শুধু আমাদের নয়, প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর মনোবল বৃদ্ধি করবে।”
গতবছর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে রাজ্যের হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতালে আরটিপিসিআর পরীক্ষার অনুমতি দেয় আইসিএমআর। তাদের নির্দেশ মতো মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে পরীক্ষা শুরু হয় এবং এর নেতৃত্ব দেন ডাঃ দেবদত্তা ধর। তিনি এবছর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
তিনি জানান, হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে প্রথম থেকেই আরটিপিসিআর পরীক্ষা হচ্ছে। একসময় অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। আইসিএমআরের গাইডলাইন অনুযায়ী আক্রান্ত ব্যক্তির সংক্রমনের মাত্রা মাপা হয় সিটি-ভ্যালু দেখে। মূলত আরটিপিসিআর পরীক্ষা হচ্ছে সিটি-ভ্যালু মাপার পদ্ধতি এবং আইসিএমআর বলছে, কোনও ব্যক্তির সিটি-ভ্যালু ৩৫-য়ের নিচে থাকলে সে পজিটিভ। অনেকের সিটি-ভ্যালু প্রায় ২০-২১-য়ের কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ তাদের সংক্রমনের মাত্রা অনেকটাই দ্রুত এবং গভীর ছিল। যাদের সিটি ভ্যালু কম ছিল এমন কিছু স্যাম্পল সম্প্রতি আইসিএমআরে পাঠানো হয়। পাঁচ রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়েন্ট পাওয়া যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, এরা প্রত্যেকেই সুস্থ হয়েছেন, অর্থাৎ শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই ভেরিয়েন্ট চিকিৎসা সফল হয়েছে।
সমীক্ষায় এটাও বলা হচ্ছে, যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন, তাদের সংক্রমণ কিছুটা মাইল্ড হতে পারে। এরপরেও যেহেতু অনেকের সংক্রমণ মাইল্ড নয়, ফলে স্যাম্পল আইসিএমআরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বরাক উপত্যকায় করোনা ভাইরাসের কোন স্টেজ চলছে সেটা পরিষ্কারভাবে জানা ছিলনা। এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে কিছু স্যাম্পল আইসিএমআরে পাঠানো হয়। এভাবে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ বরাক উপত্যকার করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিকগুলো যাচাই করতে সহযোগিতা করেছে।
ডাঃ দেবদত্তা ধর বলেন, “এবার থেকে প্রতি ১৫ দিনে বিশেষ কিছু স্যাম্পল আইসিএমআরে পাঠানো হবে। এই পরীক্ষা সরাসরি রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজে আসার নয়, মূলতঃ স্টাডির অঙ্গ হিসেবে কাজটি করা হচ্ছে। বরাক উপত্যকায় কোন স্তরে রয়েছে করোনাভাইরাস সেটা জানতে পারলে পুরো চিকিৎসা পরিকাঠামোর পরিকল্পনায় সুবিধা হয়। যাদের স্যাম্পল পাঠানো হয়েছে তারা অনেক আগেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে এই পরীক্ষাগুলো করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত চিকিৎসার গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আসবে।”
Comments are closed.